নেপালের তরাই অঞ্চল: ভিড়ের বাইরে এক নীরব সৌন্দর্যের জগৎ:
হিমালয়ের দেশ নেপাল বললেই চোখে ভাসে বরফঢাকা পাহাড়, প্রাচীন মন্দির আর ব্যস্ত পর্যটন শহরের ছবি। কিন্তু এই পরিচিত গন্তব্যগুলোর বাইরে রয়েছে এক ভিন্ন নেপাল—নীরব, সবুজ আর গভীরভাবে মুগ্ধ করার মতো। সেই অদেখা রূপের নাম নেপালের তরাই অঞ্চল।
দেশটির দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত এই নিম্নভূমি ঘিরে আছে তৃণভূমি, জলাভূমি ও ঘন অরণ্য। এখানেই প্রকৃতি এখনো নিজের ছন্দে বেঁচে আছে।

থারু জনগোষ্ঠী ও অতিথিপরায়ণ সংস্কৃতি:
প্রাচীন বিশ্বাস ও জীবনধারা
তরাই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা থারু জনগোষ্ঠী। তাদের জীবনযাপন, উৎসব ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। তারা বিশ্বাস করে—“অতিথি দেব ভবঃ”, অর্থাৎ অতিথি মানেই দেবতা। এই বিশ্বাসই তাদের আতিথেয়তাকে করেছে অনন্য।
ধান্য উৎসব ‘আউলি’ ও গ্রামীণ আতিথেয়তা:
ভাদা গ্রামের উৎসবের আনন্দ
নেপাল–ভারত সীমান্ত ঘেঁষা ভাদা গ্রামে ধান কাটা শেষ হলে উদ্যাপিত হয় ‘আউলি’ উৎসব। এটি প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ আর উৎসবের রঙ।
স্থানীয় খাবার ও ঐতিহ্যবাহী রীতি:
এই সময় তৈরি হয় পেঁয়াজ, মরিচ, কামরাঙা, ধনে ও জিরা দিয়ে তৈরি বিশেষ ঝাল-মিষ্টি আচার। উৎসবের একটি ব্যতিক্রমী রীতি হলো ধানখেতের ইঁদুর রান্না করে ভোজ হিসেবে গ্রহণ করা—যা ফসল রক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সঙ্গে পরিবেশন করা হয় স্থানীয় পানীয় ‘ছ্যাঙ’।
গ্রামের হোমস্টেগুলো পরিচালনা করেন নারীরা, যা তাদের আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা এনে দিয়েছে।
তরাই অঞ্চলের জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণী:
বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস
তরাই অঞ্চল শুধু সংস্কৃতির জন্য নয়, বন্যপ্রাণীর জন্যও স্বর্গসম। এখানে রয়েছে একাধিক সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান।
-
শুক্লা ফান্টা ন্যাশনাল পার্ক: হাজার হাজার চিত্রল হরিণ ও বিশ্বের বৃহত্তম বারাশিঙ্গা আবাসস্থল
-
বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক: বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিখ্যাত
-
চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক: ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য, যেখানে আছে এক-শৃঙ্গ গন্ডার ও এশীয় হাতি
কম ভিড়ে সাফারি ও কমিউনিটি ট্যুরিজম:
বারাউলি গ্রাম—শান্ত ভ্রমণের ঠিকানা
চিতওয়ানের পাশেই বারাউলি গ্রাম, যেখানে কমিউনিটি পরিচালিত বনাঞ্চল ও হোমস্টে রয়েছে। পর্যটকদের ন্যায্যভাবে হোস্ট পরিবারগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
হোমস্টে আয়ের বড় অংশ যায় স্থানীয় পরিবারগুলোর কাছে, আর বাকি অর্থ ব্যবহৃত হয় স্কুল, শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক কাজে। স্থানীয় গাইডের সঙ্গে সাফারিতে নারায়ণী নদী পার হয়ে দেখা মিলতে পারে বন্য শূকর, ময়ূর, হর্নবিল পাখি এবং ভাগ্য ভালো হলে এক-শৃঙ্গ গন্ডার।
পরিবেশ রক্ষা ও বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি
একসময় যেসব বন্য প্রাণীকে ফসলের শত্রু ভাবা হতো, এখন তারাই স্থানীয় মানুষের জীবিকার অংশ। নেপালের তরাই অঞ্চল ভ্রমণ প্রমাণ করে—প্রকৃতি রক্ষা করলে প্রকৃতিই মানুষকে রক্ষা করে।
শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ভ্রমণ করলে উপকৃত হয় পর্যটক, স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশ—তিন পক্ষই। তাই তরাই শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং টেকসই পর্যটনের এক অনুকরণীয় উদাহরণ।
