সময়ের আগে অফিসে এসে চাকরি হারালেন কর্মী: স্পেনের আদালতের ব্যতিক্রমী রায়
নিয়ম মানা কি সব সময়ই ইতিবাচক? স্পেনের একটি সাম্প্রতিক আদালতের রায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই নিয়মিত অফিসে উপস্থিত হওয়াকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এক নারী কর্মীকে। পরে আদালতে গেলেও মিলেনি স্বস্তি—বরং আদালতই বলেছে, দোষ ছিল তাঁরই।
আলোচিত ঘটনা—স্পেনের আলিকান্তে অঞ্চলের চাকরিচ্যুতি
স্পেনের আলিকান্তে অঞ্চলের একটি লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২২ বছর বয়সী এক নারী কর্মীর বরখাস্তের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ একটাই—তিনি প্রায় প্রতিদিনই নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই অফিসে পৌঁছাতেন।
প্রতিষ্ঠানের দাবি, এই আগাম উপস্থিতি কাজের গতি বাড়ানোর বদলে বরং কর্মপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল।
চাকরির সময়সূচি কী ছিল
চুক্তিভিত্তিক সময় বনাম বাস্তব উপস্থিতি
চাকরির চুক্তি অনুযায়ী ওই কর্মীর কর্মঘণ্টা শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে।
কিন্তু তিনি নিয়মিত সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটেই অফিসে হাজির হতেন—অর্থাৎ প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে।
এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
একাধিক সতর্কবার্তাও কাজে আসেনি
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সতর্ক করে। নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়—
-
কর্মীকে অবশ্যই নির্ধারিত কর্মঘণ্টা মেনে চলতে হবে
-
অনুমতি ছাড়া আগেভাগে অফিসে উপস্থিত হওয়া যাবে না
তবু এসব সতর্কতা উপেক্ষা করে তিনি আগাম অফিসে আসা চালিয়ে যান।
সতর্কতার পরও নিয়মভঙ্গ
প্রতিষ্ঠানের নথি অনুযায়ী—
-
সতর্কতার পরও তিনি আরও ১৯ বার সময়ের আগে অফিসে হাজিরা দিতে চেষ্টা করেন
-
ডিউটি শুরুর আগেই অফিসের ব্যবস্থাপনা অ্যাপে লগইন করার উদ্যোগ নেন
-
এসব কার্যকলাপ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার পরিপন্থী ছিল
প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কী ছিল
আদালতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সময়ের আগে অফিসে আসা দেখতে ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবে তা কার্যকর ছিল না।
প্রতিষ্ঠানের যুক্তি
প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী—
-
সহকর্মীরা প্রস্তুত না থাকায় তাঁকে কাজ দেওয়া যেত না
-
কাজের প্রবাহ নির্দিষ্ট সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল
-
আগাম উপস্থিতি দলগত কাজের ভারসাম্য নষ্ট করছিল
-
ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে আগেভাগে কাজ শুরুর চেষ্টা সহযোগিতাকে ব্যাহত করছিল
কর্মীর যুক্তি কেন গ্রহণযোগ্য হয়নি
চাকরিচ্যুত কর্মীর দাবি ছিল, অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতেই তাঁকে আগে আসতে হতো।
তবে আদালতে এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করতে পারেননি।
এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ ওঠে—
অফিসের অনুমতি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত একটি গাড়ি বিক্রি করার চেষ্টা।
আদালতের রায়—বরখাস্ত আইনসম্মত
ভ্যালেন্সিয়ার সুপ্রিম কোর্টে করা আপিল খারিজ করে আদালত রায়ে জানায়—
-
কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য
-
নিয়মভঙ্গ
-
একই আচরণ বারবার পুনরাবৃত্তি
এই বিষয়গুলো স্পেনের শ্রম আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তাই কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই কর্মীকে বরখাস্ত করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ আলবের্তো পায়া বলেন,
এই রায় প্রমাণ করে যে কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজের আগ্রহ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম ও আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্পেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা।
-
কেউ বিস্ময় প্রকাশ করে লেখেন,
“দেরি করলে শাস্তি, আগে এলে বরখাস্ত—তাহলে কর্মীর মূল্যায়ন কীভাবে হবে?” -
আবার অনেকে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ নিয়ে বলেন,
“নির্ধারিত নিয়ম ভাঙা কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না।”
উপসংহার
সময়ের আগে অফিসে এসে চাকরি হারালেন কর্মী—এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, কর্মক্ষেত্রে ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও নিয়ম ভাঙলে তার পরিণতি হতে পারে গুরুতর। আধুনিক কর্মসংস্কৃতিতে সময়ানুবর্তিতা যেমন জরুরি, তেমনি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ও নির্দেশ মেনে চলা।

