দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার সংকট: ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশে জনসংখ্যা হ্রাস একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠলেও, দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার সংকট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গভীর জনসংখ্যাগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিয়ে না করা এবং সন্তান না নেওয়ার প্রবণতা দেশটির তরুণ সমাজে দ্রুত বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক জনসংখ্যার ওপর।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাঝেও কেন পরিবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তরুণরা
গত কয়েক দশকে দক্ষিণ কোরিয়া অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন করলেও, সেই উন্নয়নের চাপই এখন নতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
-
দীর্ঘ কর্মঘণ্টা
-
তীব্র পেশাগত প্রতিযোগিতা
-
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি
এই কারণগুলো তরুণদের প্রেম, ডেটিং, বিয়ে ও সন্তানধারণ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
জন্মহার এত কম কেন—বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার হ্রাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভবিষ্যতে দেশটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। জন্মহার নিয়ন্ত্রণে না এলে প্রাকৃতিকভাবেই জনসংখ্যা এতটাই কমে যাবে যে বড় কোনো সংকটের প্রয়োজনই পড়বে না।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসতে পারে।
বিয়েতে অনীহা ও নারীদের অবস্থান
কেন বিয়ে করতে চাইছেন না নারীরা
২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী বিয়ে করতে আগ্রহী নন। এর পেছনে প্রধান কারণ—
-
গৃহকর্মের অতিরিক্ত দায়িত্ব
-
সন্তান লালনপালনের চাপ
-
পেশাগত অগ্রগতিতে বাধা
বিয়েতে অনিচ্ছুক নারীদের ৯৩ শতাংশই মনে করেন, সংসারের ভার মূলত তাদের ওপরই এসে পড়ে।
কর্মজীবন বনাম মাতৃত্ব—এক কঠিন বাস্তবতা
২০২৩ সালের সরকারি সমীক্ষায় দেখা গেছে, চাকরিজীবী নারীরা সন্তান লালনপালনকে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের নারীরা পরিবার পরিকল্পনার তুলনায় নিজের ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
লিঙ্গ বৈষম্য ও সামাজিক টানাপোড়েন
দক্ষিণ কোরিয়ায় লিঙ্গ বৈষম্যও জন্মহার সংকটকে আরও তীব্র করছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—
-
নারীবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি
-
গৃহকর্মে পুরুষ-নারীর অসম অংশগ্রহণ
এই সামাজিক বৈষম্য পারিবারিক জীবন শুরু করার আগ্রহকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান—সংখ্যায় সংকটের চিত্র
-
২০২৩ সালে মোট প্রজনন হার: ০.৭২
-
২০২২ সালে ছিল: ০.৮১
-
সুস্থ জনসংখ্যা ধরে রাখতে প্রয়োজন: ২.১
১৯৬০ সালে যেখানে একজন নারীর গড় সন্তানসংখ্যা ছিল ৬, সেখানে এখন তা ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।
ভবিষ্যতের আশঙ্কা—২১০০ সালের ভয়াবহ পূর্বাভাস
চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে জন্মহার কমতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা ৫ কোটি ২ লাখ থেকে কমে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখে দাঁড়াতে পারে।
একই সঙ্গে বাড়ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, যা অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
ডেটিং থেকে বিয়ে—সরকারি আর্থিক সহায়তা
এই সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার নিয়েছে একাধিক অভিনব পদক্ষেপ—
-
ডেটে যাওয়ার জন্য যুগলকে প্রায় ৩৫০ ডলার পর্যন্ত সহায়তা
-
রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ, সিনেমা—সব খরচে সরকারি সহায়তা
-
এমনকি যুগলের মা–বাবার সাক্ষাতের খরচও বহন করবে সরকার
বিয়ে ও সন্তানধারণে অতিরিক্ত সুবিধা
-
বিয়েতে আগ্রহী যুগল পেতে পারেন ১৩ হাজার ডলার পর্যন্ত সহায়তা
-
সন্তানধারণে আলাদা আর্থিক সুবিধা
সরকারের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে যেন কেউ পরিবার গঠনে পিছিয়ে না যান, সে লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত।
উপসংহার
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার সংকট শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ। সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন মানসিকতা, সামাজিক কাঠামো ও কর্মপরিবেশে মৌলিক পরিবর্তন।
