বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি: ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
বাংলাদেশে লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ভাইরাস। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লিভার ক্যানসারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস-বি। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ এই ভাইরাস বহন করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫.৪ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তের বড় অংশই জানে না যে তারা ভাইরাস বহন করছেন, ফলে অজান্তেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
হেপাটাইটিস-বি এবং হেপাটাইটিস-সি: বিস্তৃতি ও প্রভাব
গবেষণা দেখিয়েছে, প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে হেপাটাইটিস-বি সংস্পর্শে এসেছেন। হেপাটাইটিস-সি তুলনামূলকভাবে কম হলেও দেশে প্রায় ০.৮৪ শতাংশ বা প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত। হেপাটাইটিস-সি লিভার ক্যানসারের প্রায় ৫ শতাংশের জন্য দায়ী। তবে আশার বিষয়, অধিকাংশ লিভার রোগ প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব।
হেপাটাইটিস কীভাবে লিভারের ক্ষতি করে
হেপাটাইটিস হল লিভারের প্রদাহ, যা প্রধানত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়। হেপাটাইটিস-বি এবং সি ভাইরাস ধীরে ধীরে লিভারের কোষে বংশবিস্তার করে। দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ থাকলে লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর এবং শেষে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।
সংক্রমণের প্রধান পথ
এই ভাইরাস মূলত রক্ত এবং দেহের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। এর মধ্যে প্রধান হলো:
-
দূষিত সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার
-
অনিরাপদ রক্ত সংক্রমণ
-
আক্রান্ত মায়ের থেকে শিশুর দেহে সংক্রমণ
-
অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক
-
ক্ষতস্থানের সরাসরি সংস্পর্শ
-
জীবাণুমুক্ত যন্ত্র ছাড়া দাঁতের চিকিৎসা
-
ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং
-
ডায়াবেটিস পরীক্ষার সুচ শেয়ার করা
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: একসাথে খাওয়া, বসবাস বা সাধারণ মেলামেশার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ছড়ায় না।
সংক্রমণের ঝুঁকি
-
হেপাটাইটিস-বি: সুচ বা ধারালো বস্তুতে আঘাতের পর ২৩–৬২ শতাংশ ঝুঁকি
-
হেপাটাইটিস-সি: একই পরিস্থিতিতে প্রায় ১.৮ শতাংশ ঝুঁকি
চিকিৎসা এবং টিকার গুরুত্ব
হেপাটাইটিস-বি’র চিকিৎসা আছে, যদিও অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি। সঠিক চিকিৎসা লিভার সিরোসিস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। তবে অনুমোদন ছাড়া স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হয়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
২০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য হেপাটাইটিস-বি টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র তিন ডোজেই প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া যায়।
নিরাপদ পানি, অনুমোদিত চিকিৎসক দ্বারা দাঁতের চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং রক্ত গ্রহণের ইতিহাস থাকলে অন্তত একবার হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষা করানো উচিত। হেপাটাইটিস-সি বর্তমানে মাত্র তিন মাসের ওষুধে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য এবং ওষুধ বাংলাদেশে সহজলভ্য।
সচেতনতা মূল চাবিকাঠি
হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা ও টিকার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা অপরিহার্য। সংক্রমণের পথ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে অযথা ভয়, সামাজিক গোপনীয়তা বা ভুল তথ্য এড়ানো সম্ভব।
সাধারণভাবে রোগীর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া বা সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায় না।
