গলায় পারফিউম ব্যবহার কি আসলেই নিরাপদ? জানুন এর অজানা স্বাস্থ্যঝুঁকি
আমরা অনেকেই বাইরে বের হওয়ার আগে সতেজ অনুভব করতে গলায় বা ঘাড়ের আশেপাশে পারফিউম স্প্রে করি। সুগন্ধি আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও, গলার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এর সরাসরি ব্যবহার শরীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গলায় সুগন্ধি ব্যবহারের অভ্যাস আমাদের হরমোন সিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১. থাইরয়েড গ্রন্থির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব
আমাদের গলার ঠিক নিচেই অবস্থান করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাইরয়েড গ্রন্থি। এই গ্রন্থিটি শরীরের বিপাকক্রিয়া, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তির মাত্রা বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
-
রাসায়নিক শোষণ: গলার ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি পাতলা। ফলে পারফিউমে থাকা সিন্থেটিক কেমিক্যাল দ্রুত ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে সরাসরি থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
-
বিপাকীয় সমস্যা: দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে রাসায়নিক শোষিত হলে শরীরের স্বাভাবিক মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. হরমোনের ভারসাম্য ও এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ক্ষতি
বেশিরভাগ বাণিজ্যিক সুগন্ধিতে ‘ফথালেটস’ (Phthalates) নামক এক ধরনের সিন্থেটিক উপাদান থাকে। এটি শরীরের এন্ডোক্রাইন বা হরমোন সিস্টেমের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটায়।
কেন এটি বিপজ্জনক?
-
হরমোন অনুকরণ: এই রাসায়নিকগুলো শরীরের প্রাকৃতিক হরমোনের নকল করতে পারে, যা মস্তিষ্ককে ভুল সংকেত দেয়।
-
প্রজনন ও শক্তির মাত্রা: নিয়মিত গলার সংবেদনশীল অংশে পারফিউম ব্যবহার করলে প্রজনন ক্ষমতা এবং শরীরের এনার্জি লেভেলের ওপর সূক্ষ্ম কিন্তু ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
৩. লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
গলা হচ্ছে শরীরের লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজের একটি প্রধান কেন্দ্র। এখানে প্রচুর পরিমাণে লিম্ফ নোড এবং নালি থাকে, যা শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান (Toxins) বের করে দিতে সাহায্য করে। গলায় সরাসরি কড়া কেমিক্যালযুক্ত পারফিউম ব্যবহার করলে এই বিষমুক্তকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
৪. ত্বকের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ও পিগমেন্টেশন
গলার ত্বকে সুগন্ধি ব্যবহারের ফলে শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বাহ্যিক ক্ষতিও লক্ষ্য করা যায়:
-
অ্যালার্জি ও র্যাশ: সিন্থেটিক সুগন্ধি থেকে ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি বা দীর্ঘস্থায়ী অ্যালার্জি হতে পারে।
-
কালচে দাগ: সুগন্ধিতে থাকা অনেক উপাদান (যেমন বার্গামট) ত্বককে সূর্যের আলোর প্রতি অতিসংবেদনশীল করে তোলে। এর ফলে গলায় পিগমেন্টেশন বা কালচে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যেতে পারে, যাকে ‘সান ড্যামেজ’ বলা হয়।
৫. বিকল্প ও নিরাপদ উপায়
সুগন্ধি ব্যবহারের শখ ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, তবে অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আনা জরুরি:
-
প্রাকৃতিক সুগন্ধি: কেমিক্যালযুক্ত পারফিউমের বদলে এসেনশিয়াল অয়েল ব্লেন্ড ব্যবহার করতে পারেন।
-
রোল-অন: অ্যালকোহল-মুক্ত প্রাকৃতিক রোল-অন একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
-
ব্যবহারের স্থান পরিবর্তন: গলায় সরাসরি স্প্রে না করে কবজি বা কাপড়ের ওপর সুগন্ধি ব্যবহার করা অনেক বেশি নিরাপদ।
উপসংহার
সুগন্ধি আমাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হলেও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে নয়। গলার মতো স্পর্শকাতর স্থানে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ের দিকে নজর দিলে থাইরয়েড এবং হরমোন স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
