ফ্যাশনের আড়ালে ইতিহাস: জিনসের ছোট পকেট ও কোটের রহস্যময় বোতামের আসল কাজ কোটের রহস্যময় বোতামের আসল কাজ কি?
প্রতিদিনের পোশাকে আমরা এমন অনেক ডিজাইন বা নকশা দেখি যেগুলোকে আমরা কেবল ফ্যাশন বা সাজসজ্জা বলে মনে করি। জিনস প্যান্টের সামনের দিকের সেই ছোট্ট পকেট কিংবা স্যুট জ্যাকেটের হাতায় থাকা সারি সারি বোতাম—এগুলো কি শুধুই সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য? ইতিহাস বলছে অন্য কথা। আজ আমরা জানবো আমাদের অতি পরিচিত এই পোশাকগুলোর নকশার পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় চমকপ্রদ কিছু ঐতিহাসিক কারণ।
১. জিনসের পকেটে কেন থাকে সেই পুঁচকে পকেট?
জিনস প্যান্ট পরেন অথচ সামনের ডান দিকের বড় পকেটের ভেতর ওই ছোট্ট পকেটটি খেয়াল করেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বর্তমানে অনেকে সেখানে কয়েন বা খুচরা পয়সা রাখেন, তবে ঊনবিংশ শতকে এর উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য ছিল একদম আলাদা।
পকেট ঘড়ির সুরক্ষা
১৮ শতকের শেষ দিকে এবং ১৯ শতকের শুরুর দিকে মানুষ এখনকার মতো হাতঘড়ি পরত না। তখন ‘পকেট ঘড়ি’ বা চেইন দেওয়া ঘড়ির ব্যাপক প্রচলন ছিল। বিশেষ করে যারা মাঠে কাজ করতেন কিংবা কলকারখানার শ্রমিক ছিলেন, তাদের জন্য সময় দেখা ছিল জরুরি। কিন্তু কাজের চাপে ঘড়িটি পকেটে রাখা নিরাপদ ছিল না।
শ্রমিক ও কৃষকদের প্রয়োজন
শ্রমিক বা কৃষকেরা কাজ করার সময় ভারী কোট পরতে পারতেন না। তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই জিনসের প্যান্টে এই বিশেষ ছোট পকেটটি তৈরি করা হয়। ঘড়িটি যাতে কাজের সময় পড়ে না যায় কিংবা তাতে কোনো আঁচড় না লাগে, সে জন্যই এই আঁটসাঁট পকেটটি রাখা হতো। লেভি স্ট্রস যখন প্রথম জিনস তৈরি করেন, তখন থেকেই এটি ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যায়।
২. স্যুট বা কোটের হাতায় কেন থাকে বাড়তি বোতাম?
কোট বা ব্লেজারের হাতার নিচে সারিবদ্ধ ৩-৪টি বোতাম নিশ্চয়ই দেখেছেন। আধুনিক স্যুটের ক্ষেত্রে দেখা যায় এই বোতামগুলো ছিদ্রবিহীন হয়, অর্থাৎ এগুলো খোলা বা লাগানো যায় না। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক মজার ইতিহাস।
‘সার্জনস কাফ’ বা চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয়তা
এই বোতামগুলোকে ফ্যাশন বিশেষজ্ঞেরা ‘সার্জনস কাফ’ বলে ডাকেন। কেন এই নামকরণ? ইতিহাস বলছে, অতীতে চিকিৎসকদের বর্তমানের মতো নির্দিষ্ট অ্যাপ্রন বা মেডিকেল ইউনিফর্ম ছিল না। তারা কোট বা স্যুট পরেই রোগী দেখতেন এবং অস্ত্রোপচার করতেন।
অস্ত্রোপচারের সময় বা রক্ত নিয়ে কাজ করার সময় তাদের হাত ধোয়ার প্রয়োজন হতো। কিন্তু কোটের আস্তিন যদি বোতাম ছাড়া লম্বা হতো, তবে তা গুটিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল না। এই সমস্যা সমাধানে দর্জিরা কোটের আস্তিনে এমন বোতামের ব্যবস্থা করলেন, যা প্রয়োজনে খুলে শার্টের মতো হাত গুটিয়ে নেওয়া যায়। এতে চিকিৎসকদের কাজ করতে অনেক সুবিধা হতো।
৩. বর্তমান ফ্যাশনে এগুলোর ভূমিকা
সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। এখন আর পকেট ঘড়ি ব্যবহার হয় না, আর চিকিৎসকদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ইউনিফর্ম। তবে আধুনিক ফ্যাশন দুনিয়া এই ঐতিহ্যগুলোকে একদম বাদ দিয়ে দেয়নি।
-
ঐতিহ্যের বাহন: বর্তমানের জিনস পকেটে ঘড়ি না থাকলেও সেই পকেটটি রাখা হয় কেবল মূল ডিজাইন ধরে রাখার জন্য।
-
আভিজাত্যের প্রতীক: দামী বা কাস্টম-মেড স্যুটে আজও ‘ওয়ার্কিং বাটন’ বা সচল বোতাম রাখা হয়। এটি এখন আভিজাত্য এবং রুচির পরিচায়ক। যাদের স্যুটে বোতামগুলো খোলা যায়, তাদের পোশাককে বেশি দামী এবং মানসম্মত বলে ধরা হয়।
উপসংহার
ফ্যাশন মানে কেবল কাপড় নয়, বরং প্রতিটি সেলাই এবং নকশার পেছনে থাকে একেকটি গল্প। জিনসের সেই ছোট পকেট কিংবা কোটের হাতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা এবং প্রয়োজনের কথা। আজ যা কেবল ফ্যাশন, এক সময় তা ছিল জীবন সহজ করার এক অনন্য কৌশল।
