Bangla Tuktak

স্বর্ণ বিক্রির সময় কেন কম পাওয়া যায়

স্বর্ণ বিক্রির সময় কম পাওয়া যায়

স্বর্ণ কেনার সময় চড়া দাম হলেও বিক্রির সময় কেন কম পাওয়া যায়? জেনে নিন আসল কারণ

আদিকাল থেকেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ মানুষের প্রথম পছন্দ। বিয়ে-শাদি, উৎসব কিংবা দুর্দিনের সঞ্চয়—সবক্ষেত্রেই স্বর্ণের ওপর আমাদের আস্থা অবিচল। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন কেউ পুরনো স্বর্ণ বিক্রি করতে যান। অনেকেই লক্ষ্য করেন, যে চড়া দামে গয়না কেনা হয়েছিল, বিক্রির সময় সেই তুলনায় বেশ কম টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এই দামের পার্থক্যের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও বাণিজ্যিক কারণ রয়েছে।

১. অলংকার তৈরির মজুরি ও নকশার খরচ

আমরা যখন বাজার থেকে স্বর্ণ কিনি, তখন সেটি সাধারণত অলংকার বা গয়না হিসেবে কিনি। একটি গয়না তৈরির পেছনে কারিগরের শ্রম, নকশার জটিলতা এবং মেকিং চার্জ বা মজুরি যুক্ত থাকে। কেনার সময় গ্রাহককে স্বর্ণের মূল দামের পাশাপাশি এই মজুরিও পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু যখন সেই গয়না বিক্রি করা হয়, তখন দোকানদার কেবল স্বর্ণের ওজন ও বিশুদ্ধতা বিবেচনা করেন। নকশা বা মজুরির পেছনে খরচ করা টাকা বিক্রির সময় আর ফেরত পাওয়া যায় না।

২. ক্যারেটের পার্থক্য ও বিশুদ্ধতা

স্বর্ণের দাম নির্ভর করে তার ক্যারেট বা বিশুদ্ধতার ওপর। সাধারণত ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধরা হয়। তবে ২১ বা ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণে খাদ বা অন্যান্য ধাতুর মিশ্রণ বেশি থাকে। গয়না কেনার সময় যে ক্যারেটের দাম দেওয়া হয়, বিক্রির সময় যদি দেখা যায় স্বর্ণের মান কিছুটা কমেছে বা খাদ বেশি, তবে দাম অনেকখানি কমে যায়।

৩. ওজন ও ক্ষয়ের হিসাব

দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে স্বর্ণের অলংকারে ঘর্ষণজনিত কারণে কিছুটা ক্ষয় হতে পারে। এছাড়া গয়নায় যদি পাথর, মুক্তা বা অন্য কোনো দামি পাথর বসানো থাকে, বিক্রির সময় সেগুলোর ওজন বাদ দিয়ে নিট স্বর্ণের ওজন মাপা হয়। অনেক সময় পাথরের ওজন বাদ দেওয়ার ফলে গয়নার মোট ওজন কমে যায়, যা সরাসরি দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

৪. ভ্যাট এবং সরকারি কর

স্বর্ণ কেনার সময় সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট বা ট্যাক্স দিতে হয়। এটি একটি আইনগত প্রক্রিয়া যা প্রতিটি জুয়েলারি দোকান মেনে চলে। তবে মনে রাখা জরুরি যে, এই ভ্যাট আপনি সরকারকে দিচ্ছেন। ফলে কয়েক বছর পর যখন আপনি স্বর্ণ বিক্রি করবেন, তখন ব্যবসায়ী আপনাকে সেই ভ্যাটের টাকা ফেরত দেবেন না। এটিও ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে বড় একটি ব্যবধান তৈরি করে।

বিনিয়োগ হিসেবে অলংকার না কি গোল্ড বার?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আপনি যদি কেবল ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের কথা ভেবে স্বর্ণ কিনতে চান, তবে অলংকার কেনা খুব একটা লাভজনক নয়। কারণ এতে মজুরি ও ভ্যাটের কারণে শুরুতেই আপনার বেশ কিছু টাকা বাড়তি খরচ হয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো:

  • গোল্ড বার বা কয়েন: এতে তৈরির মজুরি খুব সামান্য বা থাকেই না।

  • ডিজিটাল গোল্ড: বর্তমানে অনেক মাধ্যমে ডিজিটাল গোল্ড কেনা যায়, যেখানে চুরির ভয় নেই এবং বিশুদ্ধতা নিশ্চিত থাকে।

স্বর্ণ বিক্রির আগে আপনার করণীয়

স্বর্ণ বিক্রি করার সময় বড় ধরনের লোকসান এড়াতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি:

  • বাজার যাচাই: কোনো একটি দোকানেই স্বর্ণ বিক্রি না করে অন্তত ২-৩টি দোকানে দর যাচাই করুন।

  • ক্যারেট পরীক্ষা: আধুনিক মেশিনের সাহায্যে আপনার স্বর্ণের ক্যারেট বা বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হয়ে নিন।

  • মেমো সাথে রাখা: স্বর্ণ কেনার সময়কার আসল মেমো বা রসিদ সাথে রাখুন। এতে ওজন ও ক্যারেট নিয়ে ব্যবসায়ীর সাথে দরদাম করা সহজ হয়।

উপসংহার: স্বর্ণ বিক্রির সময় কম দাম পাওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা বা প্রতারণা নয়। এটি মূলত বাজার ব্যবস্থা এবং অলংকার তৈরির প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তাই ভবিষ্যতে লোকসান এড়াতে স্বর্ণ কেনার আগেই আপনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাখুন—আপনি কি এটি ব্যবহারের জন্য কিনছেন, নাকি বিনিয়োগের জন্য?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *