সকালের খাবার বাদ দিচ্ছেন? নিজের অজান্তেই শরীরের যে মারাত্মক ক্ষতি করছেন
ভোরবেলা অ্যালার্ম বাজার পর থেকেই শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। অফিসের তাড়া, বাচ্চাদের স্কুল কিংবা যানজটের ভয়—এই ব্যস্ততার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের অনেকেরই সকালের প্রথম যে জিনিসটি বাদ পড়ে, তা হলো পুষ্টিকর খাবার। কেউ কেবল এক কাপ চা বা কফিতে দিন শুরু করেন, আবার কেউ ওজন কমানোর আশায় ইচ্ছে করেই না খেয়ে থাকেন। কিন্তু এই অভ্যাসটি শরীরের জন্য কতটা আত্মঘাতী হতে পারে, তা হয়তো আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না।
পুষ্টিবিদদের মতে, সকালের খাবার কোনো সাধারণ খাবার নয়; এটি হলো শরীরের ‘পাওয়ার হাউস’ বা জ্বালানি। পুষ্টিবিদ চার্লি রিফকিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিয়মিত সকালের খাবার এড়িয়ে চললে শরীরে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হয়।
১. সারাদিনের ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব
সারা রাত ঘুমের পর শরীর রি-চার্জ হওয়ার জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। আপনি যখন সকালে কিছুই খান না, তখন আপনার মস্তিষ্ক এবং শরীর প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ পায় না। এর ফলে:
-
কাজে বা পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়।
-
সামান্য পরিশ্রমেই শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
-
সারাদিন ঝিমুনি ভাব ও মাথাব্যথা কাজ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দিনের তিন বেলার খাবারের মধ্যে সকালের নাশতাই হওয়া উচিত সবচেয়ে ভারি এবং পুষ্টিকর।
২. মেজাজ খিটখিটে হওয়া ও মানসিক অস্থিরতা
খালি পেট কেবল শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক অস্থিরতারও কারণ। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীরের শর্করার মাত্রা কমে যায়, যা সরাসরি আপনার মুড বা মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত পুষ্টিকর নাশতা করেন, তাদের মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ নামক সুখী হরমোনের নিঃসরণ বেশি হয়। ফলে তাদের মন প্রফুল্ল থাকে এবং কাজের গতি বাড়ে। অন্যদিকে, নাশতা বাদ দিলে রাগ, বিরক্তি এবং অবসাদ দ্রুত ঘিরে ধরে।
৩. ওজন কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি
অনেকেই ভাবেন সকালের নাশতা বাদ দিলে ক্যালরি কম গ্রহণ করা হবে এবং ওজন কমবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। সকালে না খাওয়ার ফলে শরীর ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকে এবং দুপুরের দিকে অস্বাভাবিক ক্ষুধা লাগে। তখন মানুষ সাধারণত ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেদ বাড়ায় এবং রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
৪. হরমোনের ভারসাম্য ও মেটাবলিজমে গোলমাল
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। আপনি যদি তখন স্বাস্থ্যকর প্রোটিনযুক্ত খাবার না খান, তবে এই হরমোনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি মানসিক চাপ বৃদ্ধি, অনিদ্রা এবং বিপাক প্রক্রিয়ার (Metabolism) মারাত্মক ক্ষতি করে। প্রোটিন সমৃদ্ধ নাশতা এই কর্টিসল হরমোনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
একটি সুস্থ দেহের জন্য শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপরিহার্য। নিয়মিত নাশতা বাদ দিলে শরীরের কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যারা সকালের খাবার এড়িয়ে চলেন, তারা সাধারণ ফ্লু বা সংক্রমণে অন্যদের তুলনায় দ্রুত আক্রান্ত হন।
ব্যস্ত সকালে ঝটপট স্বাস্থ্যকর সমাধান
সময় নেই বলে নাশতা বাদ দেওয়ার অজুহাত আর নয়। হাতে সময় কম থাকলে আপনি নিচের সহজ খাবারগুলো বেছে নিতে পারেন:
-
ডিম ও ফল: একটি সেদ্ধ ডিম এবং একটি কলা বা আপেল।
-
ওটস ও দুধ: ওটসের সাথে দুধ বা দই মিশিয়ে দ্রুত খেয়ে নেওয়া যায়।
-
বাদাম ও দই: এক মুঠো কাঠবাদাম বা চিনা বাদাম শরীরের শক্তি যোগাতে দারুণ কার্যকর।
উপসংহার: শরীরের ইঞ্জিন সচল রাখতে সকালের নাশতার বিকল্প নেই। ব্যস্ততাকে তুচ্ছ করে নিজের সুস্বাস্থ্যের জন্য অন্তত ১৫টি মিনিট সময় বের করুন। মনে রাখবেন, আজকের অবহেলা ভবিষ্যতে বড় কোনো রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
