Bangla Tuktak

শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি: লক্ষণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিকারের উপায়

শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি: লক্ষণ

শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি: ডিজিটাল প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও প্রতিকারের উপায়

বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিলেও এর কিছু নেতিবাচক দিক ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর ডিজিটাল ডিভাইসের প্রভাব এখন এক বিশাল উদ্বেগের কারণ। আধুনিক জীবনযাত্রায় মা-বাবা উভয়েই কর্মজীবী হওয়ায় অনেক সময় সন্তানরা একাকী হয়ে পড়ছে। এই একাকিত্ব ঘোচাতে তাদের একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠছে মোবাইল ফোন বা ট্যাব। কিন্তু এই অভ্যাস শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে কতটা বাধা সৃষ্টি করছে, তা আমাদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শিশুদের ওপর স্ক্রিন অ্যাডিকশনের নেতিবাচক প্রভাব

মাঠের অভাব এবং নিঃসঙ্গতার কারণে এখন ঘরের কোণে শিশুদের স্মার্টফোন ডিভাইসে মগ্ন থাকতে দেখা যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’ বা পর্দায় আসক্তি তৈরি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিশু দিনে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত মোবাইল বা ট্যাবে ব্যয় করে। এই আসক্তি তাদের সামাজিক যোগাযোগ এবং খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা রেডিয়েশন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে এর মাত্রা যখন প্রতি কিলোগ্রামে ১.৬ ওয়াটের বেশি হয়, তখন তা শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গেমিংয়ের প্রতি এই অতিরিক্ত আসক্তিকে ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ভিডিও গেমের প্রভাব

পাবজি বা এই ধরনের ‘ভাইরাস গেম’ শিশুদের মনে হিংসাত্মক আচরণের জন্ম দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভিডিও গেমের দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য এবং শব্দ শিশুর মস্তিষ্কে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। ফলে শিশুরা যখন ক্লাসরুমে যায়, তখন তারা সাধারণ পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারে না। তাদের কাছে শিক্ষকের আলোচনা নিরস মনে হয়।

অতিরিক্ত ভিডিও গেম এবং টিভি দেখার ফলে শিশুদের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা লক্ষ্য করা যায়:

  • মনঃসংযোগের তীব্র অভাব।

  • চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।

  • খিটখিটে মেজাজ এবং উগ্রতা।

  • স্মৃতিশক্তি ও কল্পনাশক্তি হ্রাস পাওয়া।

  • শারীরিক ওজন বৃদ্ধি ও ঘুমের সমস্যা।

ডিজিটাল ডিভাইস বনাম হাতের লেখা ও শিক্ষা

ইংল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের কলম বা পেনসিল ধরার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আগে শিশুরা মা-বাবাকে হাতে লিখে বাজারের ফর্দ বা চিঠি লিখতে দেখত, কিন্তু এখন তারা দেখে কেবল টেক্সট করতে। গবেষণায় প্রমাণিত যে, যারা হাতে লিখে নোট নেয়, তাদের মনে রাখার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে, যারা ট্যাব বা কম্পিউটারে নোট নেয়, তাদের ধারণা ততটা স্বচ্ছ থাকে না। এই ডিজিটাল নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিভাইস ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও সময়সীমা

প্রযুক্তি যেমন আমাদের কাজের গতি বাড়ায়, তেমনি এর সঠিক ব্যবহার জানাও জরুরি। শিশুদের বয়স অনুযায়ী ডিভাইস ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা যেতে পারে:

শিশুর বয়স স্ক্রিন টাইম (সময়সীমা) করণীয়
০ – ৩ বছর একদমই নয় ছড়া, গান ও গল্পের বই শোনানো।
৩ – ৫ বছর সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট বড়দের তত্ত্বাবধানে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা।
৫ – ৮ বছর দিনে ২ ঘণ্টার কম অনলাইন ক্লাস থাকলে মাঝে বিরতি দেওয়া।

উত্তরণের উপায় ও বৈশ্বিক পদক্ষেপ

আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ইংল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আমাদের দেশেও মা-বাবাদের সচেতন হওয়া জরুরি। শিশুরা বড়দের দেখেই শেখে, তাই অভিভাবকদেরও উচিত সন্তানদের সামনে স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।

প্রযুক্তি অবশ্যই আশীর্বাদ, যদি তার ব্যবহার হয় নিয়ন্ত্রিত। শিশুদের সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধি বা নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সাহায্য করতে পারে, তবে তা যেন আসক্তিতে রূপ না নেয়। শিশুদের সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা এবং তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়াই হতে পারে এই সমস্যা থেকে মুক্তির প্রধান পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *