Bangla Tuktak

চান্দের বাত্তি এর কারিগর, আরমান খান সুরের এক অনন্য মহাকাব্য

আরমান খান সুরের

আগুনের গোলার সেই কারিগর: আরমান খানের সুরের এক অনন্য মহাকাব্য

বাংলাদেশের সংগীতাকাশে এমন কিছু নক্ষত্র থাকেন, যারা নিজেরা আড়ালে চলে গেলেও তাঁদের সৃষ্টি যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। এমনই একজন নিভৃতচারী সুরস্রষ্টা আরমান খান। আজ ৩ ফেব্রুয়ারি ছিল তাঁর জন্মদিন। ঢাকা শহরের ব্যস্ত কোনো অভিজাত রেস্টুরেন্টে কেক কেটে কিংবা নতুন কোনো মেগা প্রজেক্টের ঘোষণা দিয়ে তিনি তাঁর জন্মদিন উদযাপন করেন না অনেকদিন হলো। তবে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে কোনো বিয়ের উৎসব হোক কিংবা গায়েহলুদের আসর—যে গানটি ছাড়া এখনো উৎসব পূর্ণতা পায় না, সেটি হলো ‘নান্টু ঘটক’। সেই কালজয়ী গানের লাইন ‘পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!’ আজও মানুষের রক্তে নাচন ধরায়। অথচ সেই সুপারহিট গানের পেছনের মানুষটি আজ লাইমলাইট থেকে বহুদূরে।

উত্তরাধিকার ও সংগীতের হাতেখড়ি

১৯৭৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এক বিশেষ সংগীত পরিবারে আরমান খানের জন্ম। তাঁর রক্তে মিশে আছে সুরের উত্তরাধিকার। তাঁর বাবা আলম খান ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংগীতের এক কিংবদন্তি পুরুষ। যার হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে ‘ওরে নীল দরিয়া’ কিংবা ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’-এর মতো অমর গান। আরমান খানের চাচা হলেন বাংলা পপ সংগীতের প্রবাদপুরুষ আজম খান। বড় হওয়া এবং বেড়ে ওঠা—পুরোটাই ছিল হারমোনিয়াম, পিয়ানো আর গিটারের সুরের মাঝে।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার স্টুডিওই ছিল আরমানের প্রথম পাঠশালা। তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখতেন কীভাবে তাঁর বাবা একটি সাধারণ পঙক্তিকে জাদুকরী সুরে রূপান্তর করতেন। ১৯৯৮ সালে বাবার সাথে চলচ্চিত্রের গানে কি-বোর্ড বাজিয়ে তাঁর পেশাদার যাত্রা শুরু হয়। তবে বাবার নামের ছায়া নয়, বরং নিজের আলাদা একটি সংগীত সত্তা তৈরি করাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অডিও বাজারের ‘স্বর্ণযুগের’ কান্ডারি

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ এবং দুই হাজারের শুরুর সময়টাকে বলা হয় বাংলাদেশের অডিও বাজারের স্বর্ণকাল। সেই সময়ে প্রমিথিউস ব্যান্ডের বিপ্লবের কণ্ঠে ‘চান্দের বাতির কসম দিয়া’, আর্ক ব্যান্ডের হাসানের গাওয়া ‘শীত নয় গ্রীষ্ম নয় এসেছে বসন্ত’ কিংবা ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’—প্রতিটি গানই ছিল মানুষের মুখে মুখে। তখন আজকের মতো ইন্টারনেট বা ইউটিউব ছিল না, কিন্তু আরমান খানের গানগুলো ছিল তখনকার দিনের ‘ভাইরাল’ কন্টেন্ট।

২০০২ থেকে ২০০৫—এই মাত্র তিন বছরে তিনি প্রায় ২৩টি পূর্ণাঙ্গ অডিও অ্যালবাম উপহার দিয়েছিলেন। দিনের পর দিন স্টুডিওতে রাত কাটানো, নতুন নতুন সুরের এক্সপেরিমেন্ট এবং শিল্পীদের সাথে দীর্ঘ সময় রিহার্সাল—এই ছিল তাঁর প্রাত্যহিক রুটিন। সে সময় দেশের এমন কোনো শীর্ষ সারির শিল্পী নেই যার সাথে আরমান খান কাজ করেননি।

নাটকের আবহ সংগীতে বিপ্লব

কেবল অডিও অ্যালবাম নয়, নাটকের জগতেও আরমান খান ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা যখন বাড়তে শুরু করল, তখন নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বা আবহ সংগীতের চাহিদা বেড়ে গেল কয়েকগুণ। কিংবদন্তি নাট্যকার আবদুল্লাহ আল–মামুনের ‘জোয়ার ভাটা’ নাটকের মাধ্যমে তিনি এই পথে পা রাখেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। টানা কয়েক বছরে তিনি প্রায় ১২ শতাধিক নাটকের আবহ সংগীত পরিচালনা করেন। একটি দৃশ্যে কখন সুর বাজবে আর কখন নীরবতা বজায় রাখতে হবে—এই সুক্ষ্ম জ্ঞানই তাঁকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

অভিমান, ক্লান্তি ও সংগীত থেকে প্রস্থান

সাফল্যের তুঙ্গে থাকাকালীন আরমান খানের মনে এক ধরনের বিতৃষ্ণা বা ক্লান্তি দানা বাঁধতে শুরু করে। তিনি লক্ষ্য করেন, সংগীতাঙ্গনের অর্থনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত নড়বড়ে। মঞ্চে পারফর্ম করা শিল্পীরা ভালো অর্থ উপার্জন করলেও পেছনের মানুষগুলো—গীতিকার, সুরকার এবং যন্ত্রশিল্পীরা রয়ে যেতেন চরম অবহেলায়। একজন গীতিকার একটি গানের জন্য পেতেন নামমাত্র সম্মানী। ক্যাসেট ও সিডির কভারে তাঁদের নাম লেখা হতো অতি ক্ষুদ্র হরফে।

এরপর এলো সিডির যুগ এবং সেই সাথে শুরু হলো ভয়াবহ পাইরেসি। মেধাস্বত্বের কোনো সুরক্ষা ছিল না। যখন দেখলেন যে তাঁর তিলে তিলে গড়া সৃষ্টিগুলো কোনো সম্মানজনক প্রতিদান ছাড়াই বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৩ সালে তিনি সংগীতাঙ্গনকে বিদায় জানিয়ে পাড়ি জমান প্রকৃতির কাছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে।

নতুন জীবনের গল্প: সুর থেকে আতিথেয়তা

সংগীত থেকে দূরে গিয়ে আরমান খান জীবনের একেবারে নতুন এক অধ্যায় শুরু করেন। তিনি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’-এ বিক্রয় ও বিপণন বিভাগে যোগ দেন। সংগীতে যে ধৈর্য এবং শৃঙ্খলা তিনি রপ্ত করেছিলেন, তা কাজে লাগালেন আতিথেয়তা (Hospitality) খাতে। নিজের একাগ্রতা আর পেশাদারিত্বের মাধ্যমে তিনি দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছান। বর্তমানে তিনি সেই হোটেলের মহাব্যবস্থাপক (General Manager) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, গান ছেড়ে কেন এই পেশা? আরমান খানের উত্তরটি বেশ চমৎকার। তিনি মনে করেন, গান দিয়ে তিনি মানুষকে আনন্দ দিতেন, আর এখন অতিথিদের সেবা দিয়ে তাঁদের মানসিক প্রশান্তি দেন। তাঁর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে তিনি আতিথেয়তা খাতে দেশের সেরা মহাব্যবস্থাপক হিসেবে পুরস্কৃত হন। এটি প্রমাণ করে যে, সৃজনশীল মানুষ যে ক্ষেত্রেই যাক না কেন, মেধা ও নিষ্ঠা থাকলে সাফল্য তাঁর পদচুম্বন করবেই।

নিভৃত জীবনেও সুরের অনুরণন

সংগীতের মূল ধারা থেকে দূরে থাকলেও সংগীত তাঁর মন থেকে মুছে যায়নি। করোনাকালে ঘরবন্দি সময়ে তিনি শুরু করেছিলেন ইউটিউব চ্যানেল ‘বেস্ট অ্যান্ড গ্রেট’। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সংগীতাঙ্গন গড়ে তোলা কিংবদন্তিদের গল্প তুলে ধরেন। ২০২১ সালে তিনি নিজের কণ্ঠে ‘বন্ধু’ শিরোনামের একটি গান প্রকাশ করেন। এছাড়া চাচা আজম খানকে উৎসর্গ করে তাঁর ১০টি জনপ্রিয় গানের কথা মিলিয়ে তৈরি করেন ‘গুরু রে’ গানটি।

ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী এমি খান এবং ছেলে আরহাম ও মেয়ে আনতারাকে নিয়ে তাঁর সাজানো সংসার। অবসরে এখনো পাহাড়ের নির্জনে পিয়ানো নিয়ে বসেন তিনি। পাহাড়ের চূড়ায় বাবা-মায়ের কবরের পাশে বসে নিভৃতে সময় কাটানোই এখন তাঁর মানসিক প্রশান্তি।

শেষ কথা

আরমান খান প্রমাণ করেছেন যে, স্রোতে গা ভাসিয়ে জনপ্রিয় থাকার চেয়ে নিজের আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। আজ তাঁর জন্মদিনে তিনি হয়তো কোনো কনসার্টে মঞ্চ মাতাচ্ছেন না, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে হয়তো কোনো কিশোরের স্পিকারে ঠিকই বেজে উঠছে—‘পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!’ স্রষ্টা দূরে থাকতে পারেন, কিন্তু সৃষ্টি অমর। আরমান খানের সুরগুলো এভাবেই যুগ যুগ ধরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে মিশে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *