ওজন কমাতে প্রতিদিন কয়টি রুটি খাওয়া উচিত? জানুন সঠিক নিয়ম ও পুষ্টিগুণ
আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় রুটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ডাল, সবজি কিংবা মাংসের ঝোলের সঙ্গে গরম গরম রুটি ছাড়া অনেকেরই তৃপ্তি হয় না। তবে স্বাস্থ্য সচেতনতা বা ওজন কমানোর প্রসঙ্গ এলেই অনেকে সবার আগে খাদ্যতালিকা থেকে রুটি বাদ দেওয়ার কথা ভাবেন। অনেকেরই ধারণা, রুটি মানেই প্রচুর কার্বোহাইড্রেট যা দ্রুত ওজন বাড়ায়। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
সঠিক নিয়মে রুটি খেলে এটি ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় বাধা তো নয়ই, বরং সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
রুটির পুষ্টিগুণ ও কার্যকারিতা
গমের আটার রুটি শুধুমাত্র কার্বোহাইড্রেটের উৎস নয়, এতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন এবং ফাইবারও থাকে। আঁশযুক্ত হওয়ায় এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, ফলে বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।
সাধারণত একটি মাঝারি আকারের (প্রায় ৬ ইঞ্চি) রুটি থেকে আমরা যা পাই:
-
ক্যালরি: ৭০-৮০ কিলোক্যালরি
-
কার্বোহাইড্রেট: ১৫ গ্রাম
-
প্রোটিন: ৩ গ্রাম
-
ফাইবার: ১-২ গ্রাম
এছাড়াও যদি গমের আটার সঙ্গে বাজরা, জোয়ার বা রাগির মতো দানাশস্য মেশানো হয়, তবে এর পুষ্টিগুণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
দিনে সর্বোচ্চ কতটি রুটি খাওয়া নিরাপদ?
এক একজন মানুষের শরীরের গঠন ও পরিশ্রমের মাত্রা ভিন্ন, তাই রুটি খাওয়ার পরিমাণও ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। একজন মানুষের বয়স, উচ্চতা এবং দৈনিক শারীরিক পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে এই পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
সাধারণভাবে, একজন সুস্থ মানুষ প্রতি বেলা খাবারে ২ থেকে ৪টি মাঝারি সাইজের রুটি খেতে পারেন। তবে শরীরের ওজন ও সক্রিয়তা অনুযায়ী একটি সাধারণ হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
| শরীরের ওজন ও ধরন | দৈনিক রুটির পরিমাণ |
| ৫৫-৬৫ কেজি (অল্প পরিশ্রমী) | ৩ থেকে ৪টি রুটি |
| ৬৫-৭৫ কেজি (মাঝারি পরিশ্রমী) | ৪ থেকে ৫টি রুটি |
| ৭৫ কেজির বেশি (শারীরিক কসরতকারী) | ৫ থেকে ৬টি রুটি |
ওজন কমাতে রুটি খাওয়ার সঠিক কৌশল
আপনি যদি ওজন কমাতে চান, তবে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। একটি মাঝারি রুটিতে যেহেতু প্রায় ৮০-৮৫ ক্যালরি থাকে, তাই ওজন কমানোর সময় দিনে ৩-৪টির বেশি রুটি না খাওয়াই ভালো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরের খাবারে ২টি রুটি (প্রায় ১৬০ ক্যালরি) রাখা বেশ কার্যকর। তবে মনে রাখবেন, শুধু রুটির সংখ্যাই শেষ কথা নয়; রুটির সাথে আপনি কী খাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে আপনার ওজন কমবে কি না।
রুটির সাথে কী ধরণের খাবার রাখা জরুরি?
রুটি সবসময় ফাইবার এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের সাথে খাওয়া উচিত। যেমন:
-
প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাক-সবজি।
-
ডাল, দই বা পনির।
-
পাতলা মাছ বা মুরগির মাংস।
এসব খাবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলে শরীরে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা অনুভূত হয় না।
কোন ধরনের রুটি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর?
সব ধরণের রুটি শরীরের জন্য একইভাবে কাজ করে না। সুস্থ থাকতে সঠিক আটা নির্বাচন করা জরুরি:
-
লাল আটার রুটি: এতে প্রচুর ফাইবার থাকে যা হজমে সাহায্য করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
-
মাল্টিগ্রেইন রুটি: ওটস, বাজরা বা জোয়ারের মিশ্রণে তৈরি রুটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দারুণ উপকারী।
-
ময়দার রুটি পরিহার করুন: ময়দায় ফাইবার থাকে না বললেই চলে, যা রক্তে শর্করার পরিমাণ দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং ওজন বৃদ্ধি করে।
রুটি খাওয়ার সেরা সময় ও কিছু সাধারণ ভুল
রুটি খাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো দুপুর অথবা বিকেল। কারণ এই সময়ে আমাদের বিপাকপ্রক্রিয়া (Metabolism) সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। রাতে রুটি খেতে চাইলে ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত এবং সংখ্যায় ১-২টির বেশি না হওয়াই ভালো।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন:
-
অতিরিক্ত বড় সাইজের রুটি তৈরি করা।
-
রুটির ওপর প্রচুর ঘি বা মাখন লাগিয়ে খাওয়া।
-
ডুবো তেলে ভাজা সবজি বা ভাজির সাথে রুটি খাওয়া।
-
রুটির সাথে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ না করা।
পরিশেষে বলা যায়, রুটি মোটেও ওজন বাড়ার প্রধান কারণ নয়। বরং সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং স্বাস্থ্যকর তরকারির সাথে রুটি খেলে এটি আপনার ডায়েটকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলবে।
