Bangla Tuktak

ফাঙ্গাল সুপারবাগ আতঙ্ক নবজাতকদের এনআইসিইউতে

ফাঙ্গাল সুপারবাগ আতঙ্ক

নবজাতকদের চিকিৎসায় এনআইসিইউ (NICU) একটি ভরসার জায়গা হলেও সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেখানে এক নতুন আতঙ্কের কথা বলছে। ‘ক্যান্ডিডা অরিস’ নামের এক ভয়ংকর ছত্রাক বা ‘ফাঙ্গাল সুপারবাগ’ বাংলাদেশের কিছু হাসপাতালের এনআইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নবজাতকদের জন্য বড় ধরনের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি এবং আইইডিসিআর-এর এই যৌথ গবেষণাটি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’-এ প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন সংস্থা সিডিসি-এর অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার দুটি বড় হাসপাতালের এনআইসিইউ-তে ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়।

গবেষণায় উঠে আসা উদ্বেগজনক চিত্র

গবেষণা চলাকালীন ৩৭৪ জন নবজাতককে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে:

  • সংক্রমণের হার: প্রায় ৯ শতাংশ অর্থাৎ ৩২ জন নবজাতকের ত্বকে এই সুপারবাগের উপস্থিতি মিলেছে।

  • রক্তে সংক্রমণ: একজন নবজাতকের রক্তে এই ছত্রাক ছড়িয়ে পড়েছিল।

  • মৃত্যুঝুঁকি: সংক্রমিত হওয়া শিশুদের মধ্যে সাতজনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন, যা এই ভাইরাসের মরণঘাতী রূপকেই তুলে ধরে।

  • হাসপাতালের ভেতর সংক্রমণ: গবেষণায় দেখা যায়, ১৮ জন নবজাতক ভর্তি হওয়ার পরই এনআইসিইউ থেকে এই ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, এই সুপারবাগটি হাসপাতালের পরিবেশের মধ্যেই বিস্তার লাভ করছে।

ক্যান্ডিডা অরিস কেন এত ভয়ংকর?

বিশ্বজুড়ে এই ছত্রাককে একটি ‘সুপারবাগ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর কারণগুলো হলো: ১. প্রতিরোধ ক্ষমতা: এটি সাধারণ জীবাণুনাশক দিয়ে সহজে ধ্বংস করা যায় না। ২. দীর্ঘস্থায়িত্ব: হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, বেড বা দেয়ালের মতো পরিবেশে এটি দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। ৩. ওষুধের অকার্যকারিতা: গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ নমুনা সাধারণ ছত্রাকনাশক ওষুধ ‘ফ্লুকোনাজোল’ প্রতিরোধী। অর্থাৎ এই ওষুধ আর এই ছত্রাককে মারতে পারছে না।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি এই ছত্রাককে ‘অতিজরুরি জনস্বাস্থ্য হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সিজারিয়ান ডেলিভারি ও সংক্রমণের ঝুঁকি

গবেষণায় একটি বিশেষ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, আক্রান্ত নবজাতকদের প্রায় ৮১ শতাংশেরই জন্ম হয়েছিল সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে। গবেষকদের ধারণা, সিজারিয়ান ডেলিভারির পর মা ও শিশুকে অনেক ক্ষেত্রে বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হয়, যা এই সুপারবাগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

গবেষকদের সতর্কবার্তা ও করণীয়

আইসিডিডিআর,বি-র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. ফাহমিদা চৌধুরী জানান, এই গবেষণাটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের জীবন বাঁচাতে এনআইসিইউ-তে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সংক্রমণ ঠেকাতে গবেষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন:

  • ক্লোরিন-ভিত্তিক পরিষ্কারক: সাধারণের বদলে ক্লোরিনযুক্ত শক্তিশালী জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত হাসপাতালের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করতে হবে।

  • হাত ধোয়ার অভ্যাস: স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত হাত ধোয়ার ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে।

  • পৃথকীকরণ: কোনো নবজাতকের শরীরে এই সংক্রমণ পাওয়া গেলে তাকে দ্রুত আলাদা করে বিশেষ চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।

  • নজরদারি: দেশের প্রতিটি এনআইসিইউ-তে এই ছত্রাকের উপস্থিতি আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।

  • সূত্র : বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *