ক্যান্সার চিকিৎসায় হাহাকার: ১৭ কোটি মানুষের দেশে হাসপাতাল মাত্র একটি!
বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য ক্যান্সার চিকিৎসার আসল ভরসা বলতে গেলে কেবল একটিই হাসপাতাল। এই তেতো সত্যটি এবার নিজের মুখেই স্বীকার করে নিলেন সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ক্যান্সার শনাক্ত করা থেকে শুরু করে রোগীদের যত্ন নেওয়া—সব জায়গাতেই আমাদের দেশে এক ভয়ংকর সংকট চলছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, রোগীরা হাসপাতালে একটু জায়গা না পেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, এমনকি অনেকে রাস্তার ধারে শুয়ে দিন পার করে।
সোমবার সকালে মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ‘স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে সচিব এসব হৃদয়বিদারক তথ্য তুলে ধরেন।
কেন আমাদের দেশে মৃত্যুহার এত বেশি?
সচিব সাইদুর রহমানের মতে, প্রতি বছর দেশে ক্যান্সারে মৃত্যুর মিছিল বড় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো—রোগ শনাক্ত করতে অনেক দেরি করে ফেলা। অধিকাংশ রোগী একদম শেষ পর্যায়ে এসে হাসপাতালে ভিড় করেন। তখন ডাক্তারদের আর কিছুই করার থাকে না, ফলে মৃত্যু যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
‘ঢাকা কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা’ই কি মূল সমস্যা?
পুরো দেশের ক্যান্সার চিকিৎসার কাঠামো কেবল হাসপাতাল কেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। সচিব বলেন, দেশের যেকোনো কোণায় কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে সবার গন্তব্য হয় মহাখালীর এই একটি প্রতিষ্ঠান।
-
সমন্বয়ের অভাব: ঠিকমতো সমন্বয় না থাকায় রোগীরা ভর্তির সুযোগ পায় না।
-
দুর্ভোগের চিত্র: দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা হাসপাতালে সিট না পেয়ে ফুটপাতে বা রাস্তায় শুয়ে থাকে। এমনকি অনেক সময় ভর্তি করার জন্য তদবির পর্যন্ত করতে হয়।
পরিবারের সদস্য হারিয়ে সচিবের আক্ষেপ
আলোচনার এক পর্যায়ে সচিব বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি নিজের জীবনের করুণ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে বলেন, “এই মরণব্যাধি আমার নিজের পরিবারেও হানা দিয়েছে। আমার নিজের বড় বোন ক্যান্সারে মারা গেছেন, আমার শাশুড়িও এখন এই রোগের সাথে লড়াই করছেন।”
তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সুস্থ থাকা যে কেউ যেকোনো সময় এই মরণব্যাধির শিকার হতে পারেন। যখন নিজের আপনজন আক্রান্ত হয়, তখনই কেবল বোঝা যায় এর যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ।
স্ক্রিনিং ও শেষ সময়ের যত্নে ভয়াবহ ঘাটতি
মানুষের মধ্যে এখন সচেতনতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত সুযোগ দেশে নেই। সচিব ক্ষোভের সাথে জানান যে, সচেতন হওয়ার পর মানুষ স্ক্রিনিং করতে যাবে কোথায়? সরকারি বা বেসরকারি—কোনো খাতেই রাতারাতি এই দৈন্যদশা কাটানো সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় কষ্টের কথা হলো, মুমূর্ষু রোগীদের শেষ সময়টা যেন একটু কম যন্ত্রণায় কাটে, সেই ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বা বিশেষ যত্নের ব্যবস্থাও আমাদের দেশে নেই বললেই চলে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
সচিবের মতে, ক্যান্সার কেবল একটি শারীরিক অসুস্থতা নয়, এটি এখন একটি বড় সামাজিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো পথ এখন জানা না থাকলেও, তিনি সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর। সভাপতিত্ব করেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
