পিয়ারসিং ফ্যাশন: প্রাচীন প্রথা থেকে আধুনিক লাইফস্টাইল—জানুন খুঁটিনাটি
নিজেকে আকর্ষণীয় এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে তুলতে তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘পিয়ারসিং’ বা শরীর ছেদন এখন অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছিদ্র করে অলঙ্কার পরার এই সংস্কৃতি বর্তমানে দেশি-বেদেশি তারকাদের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। পিয়ারসিং কেবল একটি ফ্যাশন নয়, বরং এটি আত্মপ্রকাশের একটি সাহসী মাধ্যম।
পিয়ারসিংয়ের ইতিহাস ও বিবর্তন
শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ছেদ করার প্রথা একেবারেই নতুন কিছু নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন উপজাতিদের মধ্যে আদিমকাল থেকেই এর প্রচলন ছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়। আমাদের গ্রাম-বাংলার আদিবাসীদের মধ্যেও নাক, কান কিংবা ভ্রু ছিদ্র করে অলঙ্কার পরার প্রাচীন রীতি লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে সঠিক উপায়ে ছিদ্রালঙ্কারের প্রয়োগ একজন মানুষের ব্যক্তিত্বে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
শরীরের বিভিন্ন অংশে পিয়ারসিং ও তার প্রভাব
১. কর্ণ ছেদন বা ইয়ার পিয়ারসিং
কানের লতি ছিদ্র করা একটি সুপ্রাচীন এবং সর্বজনীন প্রথা। আমাদের দেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকে কানের লতি থেকে শুরু করে উপরিভাগ (পিনা) পর্যন্ত একাধিক ছিদ্র করে থাকেন। এর পেছনে কিছু বিজ্ঞানসম্মত কারণও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কানের লতির সাথে মস্তিষ্কের সংযোগ থাকে, যা পিয়ারসিংয়ের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
২. নাসিকা ছেদন বা নোজ পিয়ারসিং
বাঙালি সংস্কৃতিতে সাধারণত নাকের বাম পাশ ছিদ্র করার চল বেশি। তবে বর্তমান ফ্যাশনে নাকের উভয় পাশ কিংবা মাঝখানের অংশে ‘সেপটাম পিয়ারসিং’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা পোশাকের সাথে সেপটাম পিয়ারসিং তরুণীদের মধ্যে এক অনন্য আবেদন তৈরি করে।
৩. নাভিকুণ্ডের গহনা বা বেলি পিয়ারসিং
নাভিকে আরও আবেদনময়ী করতে উন্নত বিশ্বে নাভিকুণ্ডের অলঙ্কার ব্যবহারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। শাড়ি বা লেহেঙ্গার সাথে নাভির গহনা সাজপোশাকে নতুনত্ব নিয়ে আসে। যদিও বাংলাদেশে এর ব্যবহার সীমিত, তবে ফ্যাশন সচেতনদের মধ্যে এটি ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে।
৪. ভ্রু সজ্জা ও অন্যান্য
চোখের সৌন্দর্য এবং তীক্ষ্ণতা বাড়াতে অনেকেই ভ্রু পিয়ারসিং বেছে নেন। নারী-পুরুষ উভয়ই নিজেদের পছন্দমতো সিলভার, অ্যান্টিক বা পাথরের রিং ভ্রুতে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বহিঃবিশ্বে জিভ ও ঠোঁটে পিয়ারসিং করার চলও বেশ দেখা যায়।
পিয়ারসিংয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা
পিয়ারসিং করার আগে শারীরিক সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত:
-
শারীরিক অবস্থা: যাদের অ্যালার্জি, অ্যাজমা বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পিয়ারসিং করা উচিত।
-
সংক্রমণ রোধ: পিয়ারসিং করার পর ওই স্থানে সংক্রমণ এড়াতে অন্তত আট-নয় মাস নিয়মিত অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করে যত্ন নিতে হবে।
-
ধাতুর নির্বাচন: অলঙ্কার হিসেবে সোনা বা রূপার মতো মরচে নিরোধক ধাতু ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
-
প্রতিষ্ঠান নির্বাচন: বর্তমানে বড় বড় শপিং মল এবং নামি পার্লারগুলোতে দক্ষ হাতে পিয়ারসিং করানো যায়। সবসময় মানসম্মত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া জরুরি।
উপসংহার
সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা মেনে শরীরের বিভিন্ন অংশে পিয়ারসিং করে আপনিও নিজেকে করে তুলতে পারেন অন্যদের চেয়ে আলাদা ও আকর্ষণীয়। তবে মনে রাখবেন, ফ্যাশনের চেয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আগে। তাই হুজুগে না মেতে বুঝেশুনে পিয়ারসিং করুন এবং নিজের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করুন।
