Bangla Tuktak

প্রিয়নবী (সা.) এর রমজানের প্রস্তুতি কেমন ছিল

প্রিয়নবী (সা.) এর রমজানের প্রস্তুতি

সালফে সালেহিনরা যেভাবে রমজানের জন্য প্রস্তুতি নিতেন

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। বর্তমান সময়ে অনেকেই রমজানের প্রস্তুতি বলতে বাজার করা, ইফতারের আয়োজন বা ঘরোয়া প্রস্তুতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক যুগের মানুষ—সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিনদের কাছে রমজানের প্রস্তুতির ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাঁদের কাছে রমজান ছিল আত্মশুদ্ধি, ইবাদত বৃদ্ধি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। তাই তারা জাগতিক প্রস্তুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন আত্মিক ও ইবাদতভিত্তিক প্রস্তুতিকে।

রমজানকে কেন্দ্র করেই ছিল তাঁদের বছরের পরিকল্পনা

সাহাবায়ে কেরামের জীবনে রমজানের গুরুত্ব এতটাই ছিল যে তাদের পুরো বছরের পরিকল্পনাই এই মাসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো।

প্রখ্যাত তাবেয়ি মুয়াল্লা বিন ফজল বলেন, সাহাবায়ে কেরাম বছরের ছয় মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছার সুযোগ দেন। আবার রমজান শেষ হওয়ার পরবর্তী পাঁচ মাস তাঁরা দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তাঁদের ইবাদত ও আমলগুলো কবুল করেন।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, রমজান তাদের কাছে শুধু একটি মাস নয়; বরং পুরো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

রমজানের আগমনের জন্য নবীজির দোয়া

রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদ (সা.) নিজেও রমজানের জন্য আগ্রহভরে অপেক্ষা করতেন। রজব মাসের চাঁদ দেখা গেলে তিনি বিশেষ দোয়া করতেন—

“হে আল্লাহ! আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।”
— (সুনান বায়হাকি)

এই দোয়া মুসলমানদের মনে রমজানের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রস্তুতির গুরুত্বকে আরও জোরালো করে তোলে।

শাবান মাস ছিল ইবাদতের অনুশীলনের সময়

সালফে সালেহিনদের কাছে শাবান মাস ছিল রমজানের ইবাদতের প্রস্তুতির সময়। বিশেষ করে কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস বাড়াতে তাঁরা এই মাসে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

তাবেয়ি আমর বিন কাইস শাবান মাস শুরু হলে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য কমিয়ে দিতেন এবং অধিক সময় কোরআন তেলাওয়াতে ব্যয় করতেন। অনেক আলেম এই মাসকে “কারিদের মাস” বা তেলাওয়াতকারীদের মাস বলেও উল্লেখ করেছেন।

শাবান মাসে বেশি নফল রোজা

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) অন্য মাসের তুলনায় শাবান মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন।
— (সহিহ মুসলিম)

এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে রমজানের আগে ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছেন।

আত্মশুদ্ধি ও তওবার প্রতি গুরুত্ব

সালাফদের মতে, গুনাহ মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং ইবাদতের স্বাদ কমিয়ে দেয়। তাই তারা রমজান শুরু হওয়ার আগেই তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতেন।

তারা রমজানের ফজিলত, মাসয়ালা-মাসায়েল এবং ইবাদতের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের রমজানের মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং জান্নাতের বিশেষ দরজা রাইয়ান-এর সুসংবাদ দিতেন।
— (সহিহ বুখারি)

দান-সদকার প্রস্তুতি

রমজান মাস দান-সদকার জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন।

সাহাবিরাও তাঁর এই সুন্নাহ অনুসরণ করতেন। তারা রমজানের আগেই জাকাতের হিসাব সম্পন্ন করতেন এবং দরিদ্রদের সাহায্যের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতেন।

উপসংহার

সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিনদের জীবন থেকে আমরা বুঝতে পারি যে রমজানের প্রকৃত প্রস্তুতি কেবল বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা, কোরআন তেলাওয়াত, নফল রোজা ও দান-সদকার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করাই প্রকৃত প্রস্তুতি।

যদি আমরা তাঁদের এই আদর্শ অনুসরণ করতে পারি, তাহলে রমজানের প্রকৃত বরকত লাভ করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *