৭২ ঘণ্টা টয়লেট ব্যবহার নিষেধ! তিদোং নৃগোষ্ঠীর বিচিত্র এক বিবাহপ্রথা ও আদিম বিশ্বাস
বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনেই এক পবিত্র এবং আনন্দময় সামাজিক বন্ধন। তবে এই বন্ধনকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে এমন সব রীতি-নীতি, যা শুনলে আধুনিক সভ্যতার মানুষের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। এমনই এক অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য বিবাহপ্রথা প্রচলিত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিদোং (Tidong) নৃগোষ্ঠীর মধ্যে। এই সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী, বিয়ের পর নবদম্পতিকে টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন টয়লেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হয়।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, কয়েকশ বছর ধরে এই রীতি পালন করে আসছে তারা। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানব এই প্রথার পেছনের কারণ, ইতিহাস এবং এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে।
তিদোং নৃগোষ্ঠীর পরিচয় ও ভৌগোলিক অবস্থান
তিদোং জনগোষ্ঠী মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও (Borneo) দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। সাবাহ, কালিমান্তান এবং এর আশপাশের অঞ্চলে এদের প্রধান আবাসস্থল। ঐতিহ্যগতভাবে তারা কৃষি, মাছধরা এবং বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই সমাজে বিবাহকে কেবল দুজন মানুষের মিলন হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি দুটি পরিবার বা পুরো সম্প্রদায়ের মেলবন্ধনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
৭২ ঘণ্টার কঠোর নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতা
তিদোং সমাজের নিয়ম অনুযায়ী, বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর নবদম্পতিকে একটি নির্দিষ্ট ঘরে রাখা হয়। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার জন্য তাদের ওপর আরোপ করা হয় কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা:
-
টয়লেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: নবদম্পতি কোনোভাবেই মল-মূত্র ত্যাগ করতে পারবে না।
-
সীমিত আহার: শারীরিক চাপ কমাতে এবং মলত্যাগের বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সামান্য পরিমাণ খাদ্য ও পানীয় দেওয়া হয়।
-
গৃহবন্দি দশা: তারা তিন দিন ওই কক্ষের বাইরে যেতে পারে না।
-
পারিবারিক নজরদারি: নিয়মটি যাতে কেউ ভঙ্গ না করে, সেজন্য পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকেন।
কেন এই বিচিত্র প্রথা? বিশ্বাস ও দর্শন
বাইরের মানুষের কাছে এটি অমানবিক মনে হলেও তিদোংদের কাছে এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক বিশ্বাস।
১. দাম্পত্য কলহ থেকে মুক্তি
তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, যে দম্পতি বিয়ের শুরুর এই ৭২ ঘণ্টার পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তাদের বিবাহিত জীবন হয় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। ভবিষ্যতে বড় কোনো ঝগড়া বা কলহ তাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ আনতে পারে না।
২. সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ
তিন দিনের এই সংযমকে তিদোংরা ‘ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা’ হিসেবে দেখে। যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের ওপর পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ ঝরে পড়ে এবং তাদের সন্তানরা সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হয় বলে মনে করা হয়। এর বিপরীতে নিয়ম ভঙ্গ করলে দুর্ভাগ্য, বন্ধ্যাত্ব বা অকাল মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে বলে তাদের আদিম বিশ্বাস।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নৃবিজ্ঞানীদের মত
নৃগবেষকদের মতে, এই প্রথা কয়েকশ বছরের পুরোনো। একসময় বিয়ে ছিল বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক জোটের মাধ্যম। সম্পর্ককে পবিত্র ও অটুট রাখার অঙ্গীকার হিসেবে এই ধরণের ‘শপথমূলক আচার’ চালু হয়েছিল। এটি মূলত পারস্পরিক সহনশীলতা এবং কঠিন সময়ে একসাথে থাকার একটি প্রতীকী মহড়া।
আধুনিকতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভাব
দীর্ঘ সময় মল-মূত্র চেপে রাখা শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এর ফলে মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI), কিডনির সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। আধুনিক শিক্ষার প্রসারের ফলে বর্তমান প্রজন্মের তিদোং পরিবারগুলো এই প্রথা পালনে কিছুটা শিথিলতা দেখাচ্ছে।
-
প্রতীকী পালন: বর্তমানে অনেক পরিবার টানা ৭২ ঘণ্টার বদলে কয়েক ঘণ্টা বা একদিন টয়লেট ব্যবহার নিষেধ এই নিয়ম পালন করে।
-
প্রয়োজনীয় ছাড়: শারীরিক অসুস্থতা বা অসহ্য বোধ করলে আধুনিক তিদোং পরিবারগুলো এখন টয়লেট ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকে।
উপসংহার
তিদোং জনগোষ্ঠীর এই টয়লেট ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি ‘অদ্ভুত নিয়ম’ নয়; এটি তাদের হাজার বছরের পুরনো সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের অংশ। যদিও বিশ্বায়নের প্রভাবে এই ধরণের প্রথাগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে, তবুও তিদোংদের এই বিশ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের বিশ্বাসের জগৎ কতটা রহস্যময় এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ হতে পারে।
