ডায়াবেটিস এখন কেবল একটি সাধারণ শারীরিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক মহামারীতে পরিণত হয়েছে। এক সময় ধারণা করা হতো এটি কেবল ধনী বা শহুরে মানুষের রোগ, কিন্তু বর্তমানে গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই এই ‘নীরব ঘাতক’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনকার তরুণ প্রজন্মও এই রোগের কবলে পড়ছে।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। ২০ থেকে ৮০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১৪.২ শতাংশ। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়ের তথ্য হলো, দেশের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তাদের শরীরে এই রোগ বাসা বেঁধেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এখনই যদি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ২০৪৫ সাল নাগাদ দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১০ শতাংশেরই কারণ এই ডায়াবেটিস।
কেন বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ?
চিকিৎসকদের মতে, আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ডায়াবেটিস বিস্তারের প্রধান কারণগুলো হলো:
-
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা।
-
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: অলস জীবনযাপন এবং দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস।
-
মানসিক চাপ ও অনিয়মিত ঘুম: আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব।
জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, এখন ২৫ বছর বয়সের পর থেকেই অনেকের শরীরে ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে যারা সারাদিন অফিসে বসে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
নারী ও শিশুদের ওপর প্রভাব
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ। এটি মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।
-
যেসব নারী গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, পরবর্তী জীবনে তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।
-
এর ফলে গর্ভস্থ শিশুটিও ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
রোগ নির্ণয় ও সচেতনতার অভাব
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) মতে, বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪৩.৫ শতাংশ মানুষের রোগ নির্ণয়ই হয় না। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক মানুষ শরীরে ডায়াবেটিস নিয়ে ঘুরছেন কিন্তু তারা তা জানেন না। ফলে কিডনি বিকল হওয়া, অন্ধত্ব বা হৃদরোগের মতো জটিল সমস্যা দেখা দেওয়ার পরই তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
বাঁচার উপায় কী?
বিশেষজ্ঞরা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, প্রচুর শাকসবজি খাওয়া, চিনি ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার কমিয়ে আনা এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করার মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
