অবিবাহিতদের ক্যানসারের ঝুঁকি কি বেশি? গবেষণায় যা জানা গেছে
বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কখনো বিয়ে করেননি, তাদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বিবাহিতদের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘ক্যানসার রিসার্চ কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার ফল নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে গবেষকেরা এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, বিয়ে না করার কারণে সরাসরি ক্যানসার হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই গবেষণা দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি মিলার স্কুল অব মেডিসিনের সিলভেস্টার কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারের গবেষকেরা এই পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ১০ কোটি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় থাকা তথ্যের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ ক্যানসার রোগীর তথ্যও পর্যালোচনা করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণার প্রধান সহ-লেখক ড. পাওলো পিনহেইরোর মতে, জনসংখ্যাভিত্তিক পর্যায়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে গেলে বৈবাহিক অবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে বিবেচনায় আসে।
গবেষণায় কী তথ্য উঠে এসেছে?
গবেষণায় অবিবাহিত নারী ও পুরুষের ক্যানসারের ঝুঁকি বিবাহিতদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় সামনে এসেছে।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অবিবাহিত নারীদের জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বিবাহিত নারীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দেখা গেছে।
নারীদের সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি
অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি বিবাহিত নারীদের তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি
অবিবাহিত পুরুষদের সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকিও বিবাহিত পুরুষদের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। গবেষণার হিসাবে এই ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
কেন এমন পার্থক্য দেখা যেতে পারে?
গবেষকদের মতে, এই পার্থক্যের পেছনে শুধু বিয়ে না করাকে দায়ী করা যায় না। বরং জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণের মতো বিভিন্ন বিষয় এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষক ড. লর্না এইচ ম্যাকনিল ও ড. নম্রতা বিজয়ভার্গিয়ার মতে, অবিবাহিতদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানোর অভ্যাসও ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অন্যদিকে, ড. কেটান থাঙ্কি বলেন, বিবাহিত ব্যক্তিরা অনেক সময় জীবনসঙ্গীর উৎসাহ বা তাগিদে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বেশি আগ্রহী হন। এমনকি তাঁদের মধ্যে কোলন পরীক্ষা করানোর প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।
সামাজিক একাকিত্বও এই পার্থক্যের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে বৈবাহিক অবস্থা ও ক্যানসারের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিয়ে না করলেই ক্যানসার হয়—এ ধারণা ঠিক নয়
গবেষণার ফল দেখে ‘বিয়ে না করলেই ক্যানসার হবে’—এমন ধারণা তৈরি করা ঠিক নয়। নিউইয়র্কের অনকোলজিস্ট ড. নিকোলাস হর্নস্টাইনও জানিয়েছেন, অবিবাহিত থাকার কারণে সরাসরি ক্যানসার হয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ক্যানসার একটি জটিল রোগ। এর ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু একজন মানুষের বৈবাহিক অবস্থা নয়, বরং জীবনযাপন, পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, পারিবারিক ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর জন্য বিয়ে করা কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, পুষ্টিকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাওয়া, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকার মতো অভ্যাস স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। তাই গবেষণার ফলকে বৈবাহিক অবস্থার সরাসরি কারণ হিসেবে না দেখে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

