Bangla Tuktak

পর্যটকদের টানছে ইউরোপের ‘সবচেয়ে গোপন’ দ্বীপ ?

পর্যটকদের টানছে ইউরোপের

ইউরোপের গোপন স্বর্গে প্রকৃতি, ইতিহাস ও নির্জনতার হাতছানি

স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের তুলনামূলকভাবে নির্জন ও কম পরিচিত দ্বীপ এল হিয়েরো ধীরে ধীরে ইউরোপের আকর্ষণীয় গোপন পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বড় বড় রিসোর্ট, পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় কিংবা ব্যস্ত শহুরে পরিবেশের পরিবর্তে এই দ্বীপে পাওয়া যায় প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের অনন্য অভিজ্ঞতা। আর এসব বৈশিষ্ট্যই ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এল হিয়েরোকে আলাদা করে তুলেছে।

আটলান্টিকের বুকে নির্জন এই দ্বীপ

আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এল হিয়েরোতে যেতে হলে টেনেরিফ থেকে ফেরিতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় একসময় দ্বীপটিকে পরিচিত বিশ্বের পশ্চিমতম প্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এমনকি আমেরিকা অভিযানে যাওয়ার আগে ক্রিস্টোফার কলম্বাসও এল হিয়েরোকে ইউরোপের শেষ ভূমি হিসেবে দেখেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রায় ১০০ বর্গমাইল আয়তনের এই দ্বীপে বসবাস করেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। এখানে বড় শহরের কোলাহল নেই। পুরো দ্বীপে মাত্র একটি ট্রাফিক সিগন্যাল থাকার তথ্যও এর শান্ত পরিবেশের চিত্র তুলে ধরে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চান এমন পর্যটকদের কাছেও জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।

‘এক হাজার আগ্নেয়গিরির দ্বীপ’ কেন এল হিয়েরো?

এল হিয়েরোকে ‘এক হাজার আগ্নেয়গিরির দ্বীপ’ নামেও পরিচিত করা হয়। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আগ্নেয়গিরির গহ্বর, পুরোনো লাভার প্রবাহের চিহ্ন, সবুজ বনভূমি, খাড়া আগ্নেয় শিলা এবং নীল সমুদ্র একসঙ্গে তৈরি করেছে বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য।

দ্বীপটির একেক অংশে একেক ধরনের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির দেখা মেলে। ফলে অল্প দূরত্বের মধ্যেই পর্যটকেরা প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ উপভোগ করতে পারেন। নির্জন পরিবেশের সঙ্গে আগ্নেয় ভূপ্রকৃতির এই বৈচিত্র্য এল হিয়েরোর অন্যতম বিশেষত্ব।

কৃষি ও প্রাচীন আঙুরের জাত

পর্যটনের পাশাপাশি কৃষি ও মদ উৎপাদনও এল হিয়েরোর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে পুরোনো ও বিরল আঙুরের জাত সংরক্ষণের জন্য দ্বীপটি পরিচিত।

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আঙুরখেত ধ্বংসকারী রোগের প্রভাব পড়লেও এল হিয়েরোর আঙুরখেত সেই বিপর্যয় থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেয়েছিল। এ কারণে এখানকার আঙুর ও মদ উৎপাদনের ঐতিহ্যও দ্বীপটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

সমুদ্রের নিচেও রয়েছে বিস্ময়

এল হিয়েরোর আকর্ষণ শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণাঞ্চলের লা রেস্তিঙ্গা এবং ‘মার দে লাস কালমাস’ সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চল ডাইভিংপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

স্বচ্ছ সমুদ্রের পানি, আগ্নেয়গিরির কারণে তৈরি পানির নিচের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি এবং সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ডুবুরিদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে। যারা সমুদ্রের নিচের জগত দেখতে আগ্রহী, তাদের কাছে এল হিয়েরোর এই অঞ্চল বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

শিস দিয়ে কথা বলার অনন্য ঐতিহ্য

এল হিয়েরোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘সিলবো এরেনিও’। এটি শিসের মাধ্যমে যোগাযোগের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।

একসময় দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে এই শিসভিত্তিক ভাষা ব্যবহার করা হতো। সময়ের সঙ্গে এর ব্যবহার কমে গেলেও ঐতিহ্যটি ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দ্বীপটির ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও টিকে আছে।

পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের উদাহরণ

পরিবেশ সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এল হিয়েরো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়েছে। দ্বীপটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত ‘গোরোনা দেল ভিয়েন্তো’ প্রকল্প এখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং টেকসই পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এল হিয়েরো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসা পেয়েছে। প্রকৃতিকে রক্ষা করে পর্যটন ও স্থানীয় জীবনযাত্রার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দ্বীপটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কেন ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে আলাদা এল হিয়েরো?

এল হিয়েরোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর নিরিবিলি পরিবেশ। স্থানীয়দের মতে, এখানে পর্যটকদের টানতে বিলাসবহুল রিসোর্ট বা বড় কোনো অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। বরং ধীরগতির জীবন, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ, আগ্নেয় পাহাড়, নীল সমুদ্র এবং স্থানীয় ঐতিহ্যই এই দ্বীপের আসল সম্পদ।

ব্যস্ত শহর ও অতিরিক্ত পর্যটনকেন্দ্রিক পরিবেশ থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে চান এমন ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে তাই এল হিয়েরো হয়ে উঠছে একটি ব্যতিক্রমী গন্তব্য। প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও টেকসই জীবনযাপনের এই সমন্বয়ই দ্বীপটিকে ইউরোপের কম পরিচিত অথচ আকর্ষণীয় পর্যটনস্থানের তালিকায় জায়গা করে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *