রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন বা আলিঙ্গন করা কি জায়েজ?
ইসলামে রোজা পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। পবিত্র রমজান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, অনাচার এবং দাম্পত্য সহবাস থেকে বিরত থাকা রোজার মৌলিক শর্তের অংশ। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা বা কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না।
ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিছু কাজ রোজা ভঙ্গ করে, আবার কিছু কাজ সরাসরি রোজা নষ্ট না করলেও তা থেকে বিরত থাকা উত্তম বলে আলেমরা মত দিয়েছেন।
রোজা অবস্থায় চুম্বন ও আলিঙ্গনের বিধান
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করা বা আলিঙ্গন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ (সা.) রোজা অবস্থায় কখনও স্ত্রীকে চুম্বন করতেন এবং আলিঙ্গন করতেন। তবে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সক্ষম ছিলেন।
— (সহিহ বুখারি: ১৮৪১, সহিহ মুসলিম: ১১২১)
এই হাদিস থেকে আলেমরা বলেন, যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন এবং সহবাসের দিকে না যান, তাহলে চুম্বন বা আলিঙ্গন করা বৈধ।
কখন তা থেকে বিরত থাকা উত্তম?
যদি চুম্বন বা আলিঙ্গনের কারণে যৌন উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং সহবাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকাই উত্তম। ইসলামি পরিভাষায় এটি মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হিসেবে বিবেচিত হয়।
একটি বর্ণনায় দেখা যায়, এক যুবক একই বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাসুল (সা.) তাকে তা থেকে বিরত থাকতে বলেন। কিন্তু এক বৃদ্ধ একই প্রশ্ন করলে তিনি অনুমতি দেন।
— (মুসনাদে আহমদ)
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তির আত্মসংযম ও পরিস্থিতি বিবেচনায় বিধান ভিন্ন হতে পারে।
চুম্বন বা আলিঙ্গনের ফলে বীর্যপাত হলে কী হবে?
যদি চুম্বন বা আলিঙ্গনের কারণে বীর্যপাত ঘটে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। এ ক্ষেত্রে সেই দিনের রোজা পরে কাজা করতে হবে। তবে এর জন্য কাফফারা দিতে হবে না বলে অধিকাংশ আলেম মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে যদি শুধু মজি (পাতলা তরল) বের হয়, তাহলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। অধিকাংশ ফিকহবিদ এই মত প্রকাশ করেছেন।
রোজা অবস্থায় সহবাসের বিধান
রোজা থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর সহবাস সম্পূর্ণরূপে হারাম। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা অবস্থায় সহবাস করেন, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং তাকে কঠিন বিধানের মুখোমুখি হতে হবে।
এই ক্ষেত্রে করণীয় হলো—
-
সেই দিনের রোজা কাজা করা
-
পাশাপাশি ৬০ দিন ধারাবাহিক রোজা রাখা
অথবা -
৬০ জন দরিদ্র মানুষকে খাবার খাওয়ানো
এই বিধানকে শরিয়তে কাফফারা বলা হয়।
রমজানের রাতে দাম্পত্য সম্পর্কের অনুমতি
রোজার সময়ের বাইরে, অর্থাৎ রাতে স্বামী-স্ত্রীর মিলন করা সম্পূর্ণ বৈধ। পবিত্র কোরআন-এ আল্লাহ বলেন—
“রমজান মাসের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হওয়া বৈধ করা হয়েছে।”
— সূরা আল-বাকারা ১৮৭
তবে ফজরের আগে অবশ্যই গোসল করে পবিত্র হয়ে নিতে হবে, যাতে নামাজ আদায় করা যায়।
উপসংহার
রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন বা আলিঙ্গন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, যদি এতে সহবাস বা বীর্যপাতের আশঙ্কা না থাকে। তবে আত্মসংযম হারানোর সম্ভাবনা থাকলে এসব কাজ থেকে দূরে থাকাই উত্তম।
অন্যদিকে রোজা অবস্থায় সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এতে রোজা ভেঙে যায়। তাই রোজার পবিত্রতা বজায় রাখতে সংযম ও সচেতনতা বজায় রাখা একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
